বিনোদোন

বাসর রাতে স্ত্রীর বুকের কাছে মোটা ফ্রন্টে তার প্রাক্তনের

বাসর রাতে স্ত্রীর বুকের কাছে মোটা ফ্রন্টে তার প্রাক্তনের নাম ট্যাটু করা দেখে আমি পুরোপুরি আশাহত। হাপুস নয়নে তার দিকে মুখ তুলে তাকালাম। সে কাচুমাচু স্বরে বলল,

 

‘ আসলে তেমন কিছুই না; নামটাই শুধু…’ আরো কিছু বলতে চাচ্ছিলো কিন্তু আমার বিকৃত বদন দর্শনে বলতে বলতে তার শেষ কথাগুলো হাওয়াতেই মিলিয়ে গেলো।

 

সন্দেহ জড়ালো। ভুল দেখছি না তো? চশমা খুলে কুর্তার কোনে মুছে পুনরায় জহুরির চোখ বুলালাম। হ্যাঁ! ইংরেজি অ্যালফাবেট! ‘অ্যা বি আই আর; আবির’ নামটা জ্বলজ্বল করে ফুটে আছে। একটা দীর্ঘশ্বাস গলার কাছে পাথরের মত জেঁকে বসেছে; কিছুতেই সরছে না। আমি ঠিক বুঝতে পারছি না এখন আমার কি বলা উচিৎ। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে শুকনা কাঠ গলায় একটা খাঁকারি দিতে চাইলাম। নাহ বেরুলো না!

 

মনষ্যজীবের পরমব্রত মহারাত এই ফুলশয্যা। চির মূল্যবান আর সৌখিন মুহূর্ত গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো এই রাত কিন্তু

সেই ফুলশয্যার রাতেই যখন সঙ্গিনীর কুকর্মের চিহ্ন বুকে আঁকা থাকে তখন অন্ত আত্মার গলা ফাটানো চিৎকারের অদম্য বাসনা থাকলেও তা আর সম্ভব হয় না। হাপিত্যেশে তখন প্রাণ ওষ্ঠাগত।

 

আরো কি জানি কি ভাবতে যাচ্ছিলাম আর তখনি একটা কোমল হাত এসে আমার কপাল ছুঁলো। আমিও কলের পুতুলের মতন তার হাতখানি নিস্তব্ধে ঠেলে নামিয়ে দিলাম। বোঝাতে চাইলাম বেজায় চটে আছি। কাজ হলো না। এবার আরো শক্ত করে নতুন উদ্যমে আমায় জড়িয়ে নেবার চেষ্টা। নিজেকে কোনমতে ছাড়িয়ে রাশভারী মুখ করে কটু স্বরে বললাম,

 

‘‘ আমাকে আগে বললেও পারতে। বিয়েটা না হয় আঁটকে দিতাম।”

 

‘‘আহা এতো রাগ করছো কেনো। শুধু নামটাই তো লেখা।”

 

নীর্জবতায় বললাম,

‘‘ শুধু যে নাম‌ই লিখে রেখেছো তার প্রমাণ কিসে? যে মেয়ে তার বয়ফ্রেন্ডের নামে ট্যাটু আঁকাতে পারে তার বয়ফ্রেন্ডের সাথে আর কি‌ই বা বাকি থাকবে তা আমার অজানা নয়।”

 

পাশ থেকে একটা কান্নার ফ্যাচফ্যাচানি ভেসে এলো। বুঝলাম মন গলানোর চেষ্টা। আমি‌ও বোকা ন‌ই! আরো কঠোর হলাম। আমার রাগের পরিধি বোঝাতে খাটের পাশে আধ খাওয়া ঠাণ্ডা দুধের গ্লাস মেঝেতে ছুঁড়ে দিলাম। শব্দ হলো; ভাঙলো। কাঁচের টুকরো আর দুগ্ধ রেণুতে সারা মেঝে একাকার। ধবধবে বিন্দু গুলোতে আলো চকচক করছে।

 

একটু আগেও যে অদম্য বাসনায় উপচে উঠেছিল দেহখানা; তা এখন হাওয়া চুপসানো বেলুন। খাটের উপর সাজানো কাঁচা গাঁদার ফুল গুলোকে টেনে ছিঁড়ে দিয়েছি তখনি। নাহ আর থাকা যাচ্ছে না। টেবিলের উপর থেকে লাইটার আর সিগারেটের প্যাকেট নিয়ে ব্যথিত মনে উঠে চলে যেতে উদ্যত হলাম। বেজায় শক্তি খাটিয়ে শব্দ করে দরজা খুললাম। জেদ চেপে বসেছে মাথায়।

 

ওমা; একি! দরজা খুলতেই দেখি বড় দুই ভাবি আমতা আমতা করে মুখ লুকাচ্ছে। বুঝলাম না। ওনারা একে অন্যের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে বিড়বিড় করে বললেন,

‘‘ আমরা কিছু শুনিনি বাপু। আওয়াজ পেলাম কি যেনো কি ভাঙলো; তাই দেখতে এলাম। এসবের আমরা কিছুই জানিনা গো। আমাদের হয়েছে যতো জ্বালা।”

বলতে বলতে চলে গেলেন। তাদের জ্বালার কারণ বুঝতে চাইলাম; পারলাম না। মুখ থেকে উচ্চ স্বরে ‘ধ্যাত’ শব্দটি দুবার উচ্চারণ করলাম অজান্তেই। এরপর ভারী ভারী পা ফেলে সিঁড়ি ভেঙে ছাদে উঠে এলাম।

 

নিকষ কালো অন্ধকার। চাইলেই পূর্ণিমা রাত মিটিমিটি তারা আর জোনাকির তিড়িংবিড়িং থাকতেই পারতো কিন্তু নাহ; হয়নি। এ যেনো অন্ধকারের আলকাতরা লেপানো পৃথিবী। সব কিছু থেকে রঙ উঠে গেছে বোধহয় আমার‌ই মতোন।

 

পকেট হাতড়ে লাইটার এবং সিগারেটে দুটোই বের করলাম। লাইটারের দুবার চেষ্টায় সিগারেট প্রাণ পেলো। প্রথম বড় টানেটাই তৃপ্তি। ধোঁয়ার সাথে সাথে একটু আগের ঘটনাগুলোকে মিলিয়ে দেবার উদ্দেশ্যে। নাহ; শান্তি মিললো সিগারেট টায়। ছাদের পাচিল ধরে দাঁড়িয়ে আছি। ঘুম পাচ্ছে। চোখ ভেঙে আসছে ঘুমে।

 

দুই||

 

দুপুরের দিকে বাবা আমাকে ডাকে পাঠালেন। আমি ততক্ষণে আঁচ করে ফেলেছি কেনো এতো জরুরী তলব। গতকাল রাতেই তো সারা বাড়ি সুদ্ধ সবাই জেনে গেছে বাসর রাতেই ঝগড়া বাধাইছি। এই বার্তাবাহক হিসেবে আমার দুই ভাবির পারদর্শিতা অতুলনীয়। মুহুর্তের মধ্যে প্রচার করে ফেলার ক্ষমতা রাখেন। বাবার ঘরে ঢুকতেই; বাবা বললেন,

 

‘‘ কি সমস্যাটা কি তোমার?”

 

আমি চোখ নামিয়ে চুপ করে দাঁড়ালাম। ঢোক গিলে ছোট করে বললাম,

‘‘ কোন সমস্যা”

 

বাজখাঁই গলায় ঝাঁঝিয়ে বললেন,

‘ সারারাত নতুন বউকে ঘরে রেখে না কি ছাদে ডিঙিয়েছো? কেনো?’

কথা বললাম না।

 

‘‘ কি কথা বলছো না কেন?”

 

‘‘ এমনি।”

 

‘‘এমনি মানে? বিয়েটা তোমার কাছে ছেলেখেলা? হাঁ! কি ভেবেছিলে! ভেবেছিলে’টা কি তুমি? ওই যাত্রার মেয়েটাকেই বিয়ে করবে….. ……”

 

তাকে থামিয়ে দিয়ে সমউচ্চতায় গলা তুলে বললাম,

“ এর আগেও হাজারবার বলেছি এখনো বলছি; ওটাকে যত্রা নয় থিয়েটার বলে। ওটার আলাদা একটা আর্ট আছে; সম্মান আছে।”

 

“ ওহ আচ্ছা তুমি এখন আমাকে আর্ট শেখাবে, সম্মান শেখাবে? বাহ বেশ তো।”

 

“ না বাবা তেমন কিছু না।”

 

“ তেমন কিছু না তো কি?”

 

“ আসলে গতকাল রাতে…”

 

” হ্যা গতকাল রাতে”

 

“ আসলে বাবা’ ওর আগে একটা প্রেম ছিলো। এটা আমি জানতাম না।”

 

“ কার আগে একটা প্রেম ছিলো। কিছুই তো বুঝতে পারছি না।”

 

“ ওই যে অনুর। আমার স্ত্রীর।”

 

“ হ্যাঁ তো?”

 

“ হ্যাঁ! তো মানে?”

 

“ মানে তোমার ও তো প্রেম ছিলো। তো; তুমি কি বিয়ে করিস নি?”

 

“ কিন্তু বাবা!”

 

“কিন্তু কী?”

 

“ ওর প্রাক্তন প্রেমিকের নাম ওর বু..বু.. গায়ে! গায়ে ট্যাটু করা।”

 

“ তো?”

 

“ কি বলছো বাবা; বুঝতে পারছো না। ওর পুরাতন প্রেমিকের নাম ওর গায়ে সাটা। এটা কি ভাবে কি।”

 

বাবা ভ্রু নাচিয়ে নাচিয়ে বললেন,

“ কেনো বাবা! তোমার আর ওই যাত্রাবালা মেয়ের অন্তরঙ্গতার ছবি গুলো কোন পূণ্যের কর্ম। ব‌উমা জানে এই ছবি গুলোর কথা।”

 

আমি অবাক হয়ে গেলাম। বললাম,

 

“কী”

 

“ হ্যাঁ! বুঝেছো এ বাড়িটা আমার; এ বাড়ির প্রতিটা ইট আমার চেনা। তাই কোথায় কি আছে না আছে ওটাও আমার খুব ভালো ভাবে জানা আছে। কদিন আগে তোমার বড়ো ভাবী তোমার ঘর ঝাঁট দিতে গিয়ে ওই ছবি গুলো পায়। লুকিয়ে রাখার যোগ্যতা টুকুও তো নেই। ছিঃ কি বাজে ছবি। ওই আমাকে এনে দেখায়। তোমার গতি বুঝে তাই তো ঘটা করে তোমাকে বিয়ে করালাম। আমি বুড়ো হলেও সোনা তামার ফারাক বুঝি। তাই বলছি ভালোয় ভালোয় সোজা হ‌ও। নয় তো দেখে নিও বলে দিলাম। এবার আসতে পারো।”

 

চলে এলাম। আসতে আসতে নিজের ভুলগুলো বুঝতে চেষ্টা করছি। না ঠিকই তো। প্রেমিকার সাথে আমারো তো কত কিছুই ছিলো। কোনটাই বা বাদ দিয়েছিলাম। না আমার অনুর সাথে এহেন আচরণ করা ঠিক হয়নি। ধন্যবাদ বাবা এমন শুভ বোধ উদয়ের জন্য। ঘরে পৌঁছেই দরজা আটকে দিলাম। এই ভরদুপুরে দরজা আটকানোর কারন কেউ চাইবে না নিশ্চয়ই। গায়ে বিবাহিতের তকমা লাগানোই তো আছে। সমস্যা কি। ওই ‘আবির’ নামটি জন্য ট্যাটু রিমুভার তো আছেই।

 

গভীরতম স্পর্শের মধ্যক্ষণে আমি চমকে উঠলাম। আচমকা বিদ্যুৎ খেলে গেলো পিষ্ঠদেশে। অনুর কোমরে ক্ষুদ্রাক্ষরের ‘নয়ন’ লেখা। রেগেমেগে চিৎকার দিয়ে বললাম,

 

“নয়নটা আবার কে?”

 

অনু তাচ্ছিল্যের সাথে করুন একটা দৃষ্টি ছুড়ে দিয়ে বললো,

 

‘‘ ও কিছু নয়। নয়নকে সেই কবেই ভুলে গেছি। ও আমার এক্সের‌ও এক্স।”

 

আমি বোধহয় জ্ঞান হারাবো। সুস্থ থাকলে আবার জানাব।

•••••••••••••••••••••••••••••••••••

••••••••••••••••••••••••••|

 

গল্প: এক্সের‌ও এক্স

লেখা: তারিকুল ইসলাম শাওন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button