বিচিত্র ঘটনা

অারতি, তোমার বর খুব বড়লোক, তাই না

-অারতি, তোমার বর খুব বড়লোক, তাই না?
– হঠাৎ এপ্রশ্ন?
-ফেবুতে তোমার অ্যংগেজমেন্টের ছবি দেখছিলাম জাফরানি রঙের শাড়ি,গা ভর্তি গহনা৷
-আমি তোমাকে ব্লক করেছি অমিত।
ও এবার চিৎকার করে উঠে,
-বেশ্যামাগী তোর লজ্জা করে না ? দুই বছর আমার সাথে ফস্টিনস্টি করে মালদার পার্টি দেখে বাপের কথায় বিয়েতে রাজি হয়ে গেছত। তোদের মত মেয়েদের জন্যেই….

কট করে লাইন কেটে ফোন সুইচ অফ করে দিলাম।আমি আজমেরী হক,ডাকনাম আরতি।শুনেছি জন্মের আগেই নামটা আমার মা রেখেছিলেন।যদিও ভদ্রমহিলার নাম ধরে ডাকার সৌভাগ্য হয় নি। বহুদিন
আমার বাবা আমার মুখদর্শনও করেন নি।আমাকে জন্ম দিতে গিয়ে তার প্রিয়তমা স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছে, এব্যাপারটা তাকে পীড়া দিত ভীষণ।মাতুলালয়ে মানুষ।দাদা-দাদী খুব জোরাজুরি করলেও বাবা আমাকে দেখতে আসতেন না। শেষ পর্যন্ত বাবার সাথো যখন দেখা হল ততদিনে একপা দুপা করে হাঁটা শিখে গেছি। যা কাছে পাই হাত মুঠি করে ধরতে যাই।

এগল্পটা বাবার মুখে হাজারবার শুনেছি। বলতে বলতে বাবার মুখ উজ্জ্বল হয়৷ চোখ দুটো প্রগাঢ় মায়ায় ভরে উঠে।বাবা বলেন,

-আমি দেখলাম ছোট্ট একটা ন্যাদা ন্যাদা বাচ্চা তোর নানী বাড়ির উঠোনে খেলছে। মাথাভর্তি কালো চুল। চুলে কপাল,ভ্রু ঢেকে আছে। তোর মায়ের মত সেই নাক,সেই চোখ।আমায় দেখে ফোকলা দাঁতে ই ই করে হাসল। ওই হাসিটা আমার মন জুড়িয়ে দিল।

অমিতও তাই বলে।আমার হাসিটা নাকি খুব সুন্দর। ও বলত,
-তুমি যখন মাথা নীচু করে ঠোঁট টিপে হাসো তখন তোমার চোখ হাসে, গাল হাসে সাথে আমার হৃদয় হাসে।

অমিত।ভালো নাম মোস্তফা সারোয়ার। আমাদের বাড়ির পিছনদিকে যে কানা গলিটা গেছে তার শেষ মাথার দোতলা বাড়িটা ওদের। লন্ডনের সেন্ট্রাল সেইন্ট মার্টিনস
ইউনিভার্সিটি থেকে ইন্টারশিপ করে এসেছে। সুদর্শন, ব্যাকব্রাশ চুল। বেশ লম্বা,আমার মাথা ওর চিবুক ছুঁয়ে শেষ হয়।

আমার সাথে যখন দেখা প্রথম দেখা হল তখন ওর চোখের নীচে কালি,মুখে দাড়িগোঁফেে জঙ্গল। কেউ দেখে আন্দাজ করতে পারবে না এই ছেলে বিলেত ফেরত ডিগ্রিধারী। রকে বসে আড্ডা মারছিল। আমায় দেখে হাত নেড়ে ডাকল,

-আরতি।

-কাঁদছিলে নাকি? চোখ লাল,গাল ভেজা।

ওর দুই ঠোঁটে হাসি৷ যেন অপরিচিতা একটা মেয়ে কান্না খুব মজার কিছু।

-কান্নাকাটির দাম নাই । জীবনটাকে ইনজয় কর। এক প্যাকেট বেনসন এনে দিতে পারবে? মোড়ের দোকানে গিয়ে বললেই হবে অমিত ভাই দিতে বলছে।

আমার তখন বোধশূন্য অবস্থা। অন্য সময় হলে হয়ত অপমানিত বোধ করতাম, প্রতিবাদ করতাম কিন্তু তখন তার আজ্ঞা পালন করলাম।আমার আসলে নিজের মনটাকে শান্ত করতে কিছু একটা করার প্রয়োজন ছিল।
অমিত সিগারেট পেয়ে ভীষণ অবাক হল।

-তুমি তো দেখছি লক্ষী মেয়ে। আরে দাঁড়াও … দাঁড়াও কই যাও? কাঁদছিলে কেন?
ও আমার পিছন পিছন হাঁটা শুরু করল।
-বললে নাতো কাঁদছিলে কেন?
আমার বয়ফ্রেন্ড…..
-কি? ব্রেক আপ করেছে। হা হা হা

ও প্রানখুলে হাসল। কান্নার দমকে আমি কথা বলতে পারছিলাম না ও যেন বহুদিনের চেনা এমন ভঙ্গীতে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।

-এই দেখ, আমার গার্লফ্রেন্ডও আমায় ছেড়ে চলে গেছে।স্প্যানিশ মেয়ে,পরীর মত দেখতে। ইহুদি মেয়ের সাথে ডেট করছি শুনে বাবা বলেছিল ত্যাজ্য পুত্র করবে তারপরও ওকে ছাড়ে নি।দুজনে বিয়ে করব বলে ঠিক করেছিলাম কিন্তু আমার সুইটহার্ট একটা সেক্স ম্যানিয়াক দেখে ভেগে গেল। বীচ!

ওর চোখমুখে বিতৃষ্ণা।
-তোমাদের বাড়ি কোথায়?

ইঙ্গিতে দেখালাম।

-ও তুমি আদনান সাহেবের মেয়ে। যাও বাড়ি যাও৷বাচ্চাদের মত কান্নাকাটি না করে গ্রো আপ হতে শিখো। আবার দেখা হবে। ও হাত নেড়ে বিদায় দিল।

শুরুটা ছিল এইরকম। দুজন পথভ্রষ্ট মানুষ দুজনকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছিলাম । মাঝেমধ্যে কথা হত টুকটাক কথা হত। আমিই ওর আইডি খুঁজে রিকুয়েষ্ট পাঠিয়েছিলাম।কারণ ওই একমাত্র মানুষ যার সাথে কথা বললে হৃদয়ের ক্ষত জ্বালাপোড়া করে কম। বেঁচে থাকার সুখ পাওয়া যায়।

অমিত যার পছন্দ ছিল বেশি করে কাঁচা মরিচ দিয়ে রাঁধা সর্ষে ইলিশ। বিরিয়ানি পছন্দ অথচ পোলাওয়ের চালে নাক সিটকায়।ওর জন্যে নাজিরশাইল চালের বিরিয়ানি রাঁধতে শিখেছিলাম।যার দিনে কয়েকবার আমাকে দেখতে ইচ্ছা হত। মাঝরাতে ছাদে উঠে হাত নাড়তাম নীচ থেকে আমার ছায়াটুকু দেখে বুক ভরা প্রশান্তি নিয়ে সে ঘুমাতে যেত।

আমার মায়ের অভাব ছিল,বুকের ভেতর আরেকজনের জন্যেও শূন্যতায় খা খা করত।কিন্তু অমিত আমার সবটুকু দুঃখ এক নিমেষে কেড়ে নিয়েছিল। ও বলত,

-দেখ আরতি। তুমি আমাকে মারো কাটো যা খুশি করো কিন্তু দয়া করে তোমার এক্স বয়ফ্রেন্ডের গল্প বলো না।ইচ্ছা হয় শালাকে জ্যান্ত কবর দিয়া আসি।

আমি মুগ্ধ হয়ে ওর ভালোবাসা উপভোগ করতাম।কাছে থাকলে ওর হাতের আঙুল নানা ছুতোয় আমায় স্পর্শ করার বাহানা খুঁজে। ওর পাগলামি লক্ষ্য করে ওর হাত খানা কোমরে জড়িয়ে নেই। আবেশে চোখ বুজে আসে । সম্ভবত এটাই প্রেম,কারো সামান্য স্পর্শে শরীর জুড়ে কুলকুলে সুখ, তার সাথে একদিন কথা না বললে হৃদয় জুড়ে টর্নেডো বয়।সে যত টা না সুখ তারচেয়ে অনেক বেশি অসুখ…

বাকিটা কাল লেখি

#গল্পঃ চৈত্রমাস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button